অগ্নিশিখা: মান্না ভাই, কেমন আছেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: ভালো আছি।
অগ্নিশিখা: দুবছর আগের এমন দিনে জুলাই দানা বাঁধতে শুরু করেছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে ২৪ এর জুলাইয়ে মানুষ বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল; সেই প্রত্যাশার কতখানি বাস্তবায়ন করা গেল?
মাহমুদুর রহমান মান্না: যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল, তা ছিল আকাশছোঁয়া। সে সময় একটা স্লোগান উঠেছিল দেশ বদলের, নতুন বাংলাদেশ গড়ার। এককথায় এমনভাবে বলব, আমরা যে নতুন দেশ চেয়েছি তা গুণগত ভাবে উন্নত। সেখানে জীবন উপভোগ করার মত, যেই জীবন অন্তত ক্লেদাক্ত নয়, নির্যাতিত নয়। শামসুর রাহমানের 'সম্পাদক সমীপেষু' কবিতাটি আমি প্রায়ই বলি, নিজের জন্য বলি; সকলের জন্য বলি। 'আমরা বাগান চাই আমরা ক’জন অকপট, শান্তিবাদী ক্লান্ত নাগরিক এমন বাগান চাই যেখানে ফুলের কাছে সহজে পারবো যেতে, ঘাসে চিৎ হয়়ে শুয়়ে দিব্যি পা দুটো নাড়বো অকারণ মাঝে মাঝে।'
কতটা এগিয়েছি নতুন বাংলাদেশের পথে? জুলাই আকাঙ্ক্ষার কতোটা বাস্তবায়ন হলো? খুব নির্মোহ ভাবে বললে এই প্রশ্নই অবান্তর। আকাঙ্ক্ষার তুলনায় বলতে গেলে বাস্তবায়নের শুরুই করতে পারিনি।
এটা তো কেবল আবেগের ব্যাপার নয়, একটা কর্মসূচির ব্যাপার, এখানে সুচিন্তিত একটা কর্মপদ্ধতির লাগবে। সেই জন্য দেশের ক্রিয়াশীল প্রায় সকল রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপে বসেছিল ঐক্যমত্য কমিশন নামে। দীর্ঘ সাত- আটমাস ধরে চলে আলোচনা।
আলোচনার মাধ্যমে সংস্কারের একটা রূপরেখাও তৈরী হয়েছিল। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনই ছিল মূল লক্ষ্য, নতুন সরকার এসে বাকী সংস্কারটুকু করবে- এমনটাই প্রত্যাশা ছিল।
গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন হয়েছে এটা বলা উচিৎ হবে। তবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, এমনটা হয়নি। সবদিক থেকে গুণমানসম্পন্ন নির্বাচনও বলা যায় না।
নির্বাচিত সরকারের কাছে সবাই আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবার সাথে আলোচনা করে, আলোচনার নির্যাসটা ঠিক রেখে ড্রাফ্ট করা ১৩৩ টি অধ্যাদেশ তারা জারি করবে এবং কাঙ্খিত সংস্কার করবে।
একটা সনদ তৈরী করা হয়েছিল। এই জুলাই সনদ, পরবর্তী কালে তার ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বিমত হয়ে গেল।
প্রধান যে দাবী ছিল, যেন স্বৈরতন্ত্র বারেবারে ফিরতে না পারে তার জন্য সংবিধান সংস্কার এবং রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের দাবী। এই পরিবর্তনের ব্যাপারে খুব অল্প সময়েই নির্বাচনে জয়ী দল এবং বাকী প্রায় সব দলগুলোর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে গেল।
অধ্যাদেশ দিয়ে এসব সংস্কার হলে পরবর্তীতে এ নিয়ে মামলা হলে হাইকোর্টের রায়-এ তা বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই তারা সবাই নতুন সংসদকে গাঠনিক ক্ষমতা দিতে ঐক্যমত্যে পৌঁছেছিল। তারা নতুন সংবিধান বানাবে না, তারা এই সংবিধান ঢেলে সাজিয়ে তা গণতন্ত্রের জন্য উপযোগী করে তুলবে।
প্রথম বিপত্তি বাঁধল যখন নির্বাচিত সরকার বি এন পি এই মতের সাথে একমত থাকল না। জুলাই সনদে বিএনপি এমন একটা ধারা রেখেছে, নির্বাচনে যারা জনগণের ম্যান্ডেড পাবে তারা নিজেদের মত করে সংস্কার করতে পারবে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কথাটা দুরকম হয়ে যায় এবং তা আর দাঁড়ায় নাই।
আমি যে সংস্কারের কথা বললাম, এটা হলো রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রকাঠামোগত সংস্কার। কিন্তু এই সংস্কার বলতে এর আরও অনকেগুলো দিক আছে। আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক সংস্কার। প্রশাসনিক বলতে আবার সিভিল, ব্যূরোক্রেসি, পুলিশ, আর্মি সহ সকল প্রশাসন। এগুলো ভালো করে আলোচনাই হতে পারে নাই, এগুলো আনটাচ্ড্। সামগ্রিক সংস্কার নিয়ে আলোচনাই হয় নাই।
'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, সুপ্রীম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, জাতীয় সংসদ সচিবালয় অধ্যাদেশ' ঐক্যমত্য হয়েছিল, জরুরী ভিত্তিতে অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়েছিল তারও কিছুকিছু ইতোমধ্যে বাতিল করে দেয়া হয়েছে।
এক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার সহ আরও কিছু অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে। যদি তাই হয়, তবে তা রেখেও পূণর্গঠন করা যেত। তাহলে ১৮০ দিনের যে বাধ্যবাধকতা আছে তার মধ্যেই এগুলো সমৃদ্ধ করে কার্যকর করা সম্ভব হতো! এখন মনে করা যায় ঐ জিনিসগুলো আর হচ্ছে না। এত শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া সু্যোগ হয়তো কোন কাজেই লাগানো গেল নাৃ
অগ্নিশিখা: প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: এটাকে আমি একটা স্মার্ট মূভ মনে করি। আমরা যারাই সরকার গঠন করি, তাদেরই প্রথমে ভারত সফর করতে হবে, তা কেন? ভারতে আমরা যাবো না, তা তো বলিনি। ভারতের সাথে শত্রুতার সম্পর্ক-তো আমরা চাই না। আমারা তাদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক চাই। কিন্তু যে কোন কারনে আমরা যদি মালয়েশিয়ায় যাই তবে দোষের কি?
আমাদের-তো চীনেরও বন্ধুত্ব দরকার, আমেরিকার বন্ধুত্বও আমরা চাইছি।প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের নির্যাসটা এখনও আমাদের কাছে, অন্তত আমার কাছে স্পষ্ট নয়।
আর্থিকভাবে যদি বিবেচনা করি তাহলে মোংলা পোর্ট বিনির্মাণে তারা সহযোগীতা করবে, সেটা একটা ভালো দিক। শি জিন পিং একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায়। তখন তিনি ২০ বিলিয়ন ডলারের কমিটমেন্ট করেছিলেন, তার মধ্যে চার-সাড়েচার বিলিয়ন ডলার ডেসপাচ হয়েছিল। সে ব্যাপারে আর কোন আলাপ হয় নাই। অর্থনীতি বা অন্যান্য সহযোগীতার ক্ষেত্রে কি কি আলোচনা হয়েছে তাও অবশ্য বলা যায় না। বোধহয় ১৫টা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং সই হয়েছে। কেউ কেউ বলছে একটা-দুটা চুক্তিও সই হয়েছে, সেটা অবশ্য স্পষ্ট নয়। চীন থেকে একটা করিডোরের কথা বলা হয়েছে মিয়নমার হয়ে বাংলাদেশ। যদিও করিডোর নিয়ে বাংলাদেশ এখনও স্পষ্ট কোন বক্তব্য দেয়নি।
পদ্মা ব্যারেজের এবং তিস্তা ব্যারেজের ব্যাপারে চীন সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছে বলে বলা হয়েছে। এটা কতটা আশ্বাস আর কতটা কমিটমেন্ট তা আমরা জানিনা। এ ব্যাপারে চীন বাংলাদেশ যৌথ ইশতেহারে কিছু নাই।
শি আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যে যৌথ ঘোষণা এসেছে, সেখানে এমন একটি কথা আছে যে, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্বের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রাখে এবং সম্মান করে। এইটা বাংলাদেশকে এক্সট্রা শক্তি দেয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভয় পায়, শংকা করে তখন তা ব্যালেন্সিং ফ্যাক্টরের কাজ করে।
এই সম্মান, শ্রদ্ধা আবার আন-কন্ডিশনাল নয়। বিনিময়ে তাইওয়ান যে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তা আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এবং সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করতে হয়েছে। ইতিপূর্বে এত ক্লিয়ারলি বলা হয় নাই। বরঞ্চ, বি এন পি সরকার ২০০৪ সালে তাইওয়ানকে ট্রেড সেন্টার খোলার অনুমতি দিয়েছিল।
তারপরও প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে আমি খাঁটো করে দেখব না। বিগত পনেরো বছরের আওয়ামী শাসনামলে বাইল্যাটারাল চুক্তির ক্ষেত্রে আমরা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এরকম অনেক অভিজ্ঞতা আছে, অভিন্ন নদীর পানির ক্ষেত্রে আমরা শেয়ার পাইনি। আমাদের ফারাক্কা, টিপাইমুখ, তিস্তা সমস্যার কোন সমাধান পাইনি। প্রায় ৫৩ টি নদীর প্রবেশমুখে বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিয়েছে ভারত।
এ সমস্ত জায়গায় বাংলাদেশ এখন স্ট্রংগার হবে। সেই সব দিক থেকে এই সফর খুবই পজিটিভ।
অগ্নিশিখা: এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমরা যে চুক্তি করেছি সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ নয় এমন কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তারাষ্ট্রের অবগতি করতে হবে। যেমন আমরা যখন তেল নেব রাশিয়া থেকে তখন আমেরিকান কনসার্ন নিতে হয়েছে। সমরাস্ত্র কেনা এবং বেশ কিছু ট্রেড এর ক্ষেত্রে ওদের কথার বাইরে যাওয়ার উপায় নাই।
কিন্তু চীনের সাথে আমরা যে সহযোগীতার কথা বললাম, সেই সহযোগীতা আমেরিকার সাথের চুক্তিকে অতিক্রম করতে পারে কি না এটা ভবিষ্যতে দেখতে হবে।
এখন পর্যন্ত সরকার এই বিষয়ে কিছু বলেনি। যেমন বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ক্ষেত্রে ভারতের বিরোধীতা ছিল, একভাবে আমেরিকারও বিরোধীতা ছিল। এখন যে চায়না, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ করিডোরের কথা বলা হচ্ছে সেটা বি আর ই নয়, কিন্ত অনেকটা একইরকম। দেখা যাক এটাকে তারা কিভাবে নেয়, এবং বাংলাদেশ কিভাবে এটা হ্যান্ডেল করতে পারে?
একটা প্রশ্ন এসেই যায়, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে আমরা কি বন্ধু তৈরী করলাম বেশি, না শত্রু? না কি বন্ধুত্বের নামে লোক দেখানো কিছু একটা?
চীনের সফরকে একদিকে খুব ভালো বলা যাবে যদি বাংলাদেশ এগুলোকে ঠিকমতো ব্যালেন্স করতে পারে। যদি না করতে পারে সেটা আমাদের জন্য অনেক অস্বস্তির হবে।
অগ্নিশিখা: বাংলাদেশে ঐতিহ্যগত ভাবে যেকোন সফরশেষে একটা কমন প্রশ্ন করা হয়, সেই প্রশ্নের উত্তরে আপনি কি বলবেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: এইখানে আমি আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রী যেভাবে কথা বলেছেন, আমি তার কাছাকাছি থাকব। তিনি বলেছেন, কি পেলাম এমন প্রশ্ন কেন আসবে, আমরা কি ভিক্ষা করতে গিয়েছি? চীন আমাদের টাকা দেবে, এই আশায় আমরা যাইনি। আমরা যে ভরসার জায়গা তৈরী করতে পেরেছি সেটাই বড় কথা।
যদি সত্যি সত্যি এমনটা হয়, চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে সত্যিই কমিটেড থাকে তাহলে বহু ক্ষেত্রেই আমরা শক্ত অবস্থানে থাকব।
আমরা এখনও বর্ডার কিলিং বন্ধ করতে পারিনি, পুশ-ইন চলছেই। যদিও প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর পুশ-ইন খুবই দূর্বল হয়েছে। এটা যে শুধু চীন সফরের জন্যই হয়েছে অমনটা বলব না। কিন্তু তারপরও ভারত সরকার এটা এখন নিশ্চয় বুঝে, পুশ-ইন করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে দূর্বল করার বিষয়টা এখন আর ওয়ার্ক করে না।
জুলাই সনদ, বাজেট, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জনগনের অধিকার প্রশ্নে বিএনপি সরকারের সাথে বিরোধী দলের দরকষাকষি কোন পর্যায়ের বলে মনে করেন?
দরকষাকষি নেই বললেই চলে। জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দল সংসদের বাইরে কিছু কথা বলেছে, কিন্ত সংসদে প্রায় নিশ্চুপ। আমেরিকার সাথে চুক্তি সহ আরও কিছু প্রসঙ্গে সতন্ত্র সাংসদ বিল উত্থাপন করতে পাঁচজন সাংসদের স্বাক্ষর যোগাড় করতে পারেনি। বাজেট নিয়ে কোন সংশোধনী বিরোধী দল দেয় নি। এ তো বিনা বাক্যে মেনে নেয়া। সরকারের কাজগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা সরকারকেই সমৃদ্ধ করে, সেই সাথে সংরক্ষণ করে দেশের স্বার্থ। এর মাধ্যমে বিরোধী দল রক্ষা করতে পারে জনগনের দেয়া পবিত্র ম্যান্ডেটের সম্মান।

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
অগ্নিশিখা: মান্না ভাই, কেমন আছেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: ভালো আছি।
অগ্নিশিখা: দুবছর আগের এমন দিনে জুলাই দানা বাঁধতে শুরু করেছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে ২৪ এর জুলাইয়ে মানুষ বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল; সেই প্রত্যাশার কতখানি বাস্তবায়ন করা গেল?
মাহমুদুর রহমান মান্না: যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল, তা ছিল আকাশছোঁয়া। সে সময় একটা স্লোগান উঠেছিল দেশ বদলের, নতুন বাংলাদেশ গড়ার। এককথায় এমনভাবে বলব, আমরা যে নতুন দেশ চেয়েছি তা গুণগত ভাবে উন্নত। সেখানে জীবন উপভোগ করার মত, যেই জীবন অন্তত ক্লেদাক্ত নয়, নির্যাতিত নয়। শামসুর রাহমানের 'সম্পাদক সমীপেষু' কবিতাটি আমি প্রায়ই বলি, নিজের জন্য বলি; সকলের জন্য বলি। 'আমরা বাগান চাই আমরা ক’জন অকপট, শান্তিবাদী ক্লান্ত নাগরিক এমন বাগান চাই যেখানে ফুলের কাছে সহজে পারবো যেতে, ঘাসে চিৎ হয়়ে শুয়়ে দিব্যি পা দুটো নাড়বো অকারণ মাঝে মাঝে।'
কতটা এগিয়েছি নতুন বাংলাদেশের পথে? জুলাই আকাঙ্ক্ষার কতোটা বাস্তবায়ন হলো? খুব নির্মোহ ভাবে বললে এই প্রশ্নই অবান্তর। আকাঙ্ক্ষার তুলনায় বলতে গেলে বাস্তবায়নের শুরুই করতে পারিনি।
এটা তো কেবল আবেগের ব্যাপার নয়, একটা কর্মসূচির ব্যাপার, এখানে সুচিন্তিত একটা কর্মপদ্ধতির লাগবে। সেই জন্য দেশের ক্রিয়াশীল প্রায় সকল রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপে বসেছিল ঐক্যমত্য কমিশন নামে। দীর্ঘ সাত- আটমাস ধরে চলে আলোচনা।
আলোচনার মাধ্যমে সংস্কারের একটা রূপরেখাও তৈরী হয়েছিল। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনই ছিল মূল লক্ষ্য, নতুন সরকার এসে বাকী সংস্কারটুকু করবে- এমনটাই প্রত্যাশা ছিল।
গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন হয়েছে এটা বলা উচিৎ হবে। তবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, এমনটা হয়নি। সবদিক থেকে গুণমানসম্পন্ন নির্বাচনও বলা যায় না।
নির্বাচিত সরকারের কাছে সবাই আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবার সাথে আলোচনা করে, আলোচনার নির্যাসটা ঠিক রেখে ড্রাফ্ট করা ১৩৩ টি অধ্যাদেশ তারা জারি করবে এবং কাঙ্খিত সংস্কার করবে।
একটা সনদ তৈরী করা হয়েছিল। এই জুলাই সনদ, পরবর্তী কালে তার ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বিমত হয়ে গেল।
প্রধান যে দাবী ছিল, যেন স্বৈরতন্ত্র বারেবারে ফিরতে না পারে তার জন্য সংবিধান সংস্কার এবং রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের দাবী। এই পরিবর্তনের ব্যাপারে খুব অল্প সময়েই নির্বাচনে জয়ী দল এবং বাকী প্রায় সব দলগুলোর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে গেল।
অধ্যাদেশ দিয়ে এসব সংস্কার হলে পরবর্তীতে এ নিয়ে মামলা হলে হাইকোর্টের রায়-এ তা বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই তারা সবাই নতুন সংসদকে গাঠনিক ক্ষমতা দিতে ঐক্যমত্যে পৌঁছেছিল। তারা নতুন সংবিধান বানাবে না, তারা এই সংবিধান ঢেলে সাজিয়ে তা গণতন্ত্রের জন্য উপযোগী করে তুলবে।
প্রথম বিপত্তি বাঁধল যখন নির্বাচিত সরকার বি এন পি এই মতের সাথে একমত থাকল না। জুলাই সনদে বিএনপি এমন একটা ধারা রেখেছে, নির্বাচনে যারা জনগণের ম্যান্ডেড পাবে তারা নিজেদের মত করে সংস্কার করতে পারবে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কথাটা দুরকম হয়ে যায় এবং তা আর দাঁড়ায় নাই।
আমি যে সংস্কারের কথা বললাম, এটা হলো রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রকাঠামোগত সংস্কার। কিন্তু এই সংস্কার বলতে এর আরও অনকেগুলো দিক আছে। আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক সংস্কার। প্রশাসনিক বলতে আবার সিভিল, ব্যূরোক্রেসি, পুলিশ, আর্মি সহ সকল প্রশাসন। এগুলো ভালো করে আলোচনাই হতে পারে নাই, এগুলো আনটাচ্ড্। সামগ্রিক সংস্কার নিয়ে আলোচনাই হয় নাই।
'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, সুপ্রীম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, জাতীয় সংসদ সচিবালয় অধ্যাদেশ' ঐক্যমত্য হয়েছিল, জরুরী ভিত্তিতে অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়েছিল তারও কিছুকিছু ইতোমধ্যে বাতিল করে দেয়া হয়েছে।
এক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার সহ আরও কিছু অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে। যদি তাই হয়, তবে তা রেখেও পূণর্গঠন করা যেত। তাহলে ১৮০ দিনের যে বাধ্যবাধকতা আছে তার মধ্যেই এগুলো সমৃদ্ধ করে কার্যকর করা সম্ভব হতো! এখন মনে করা যায় ঐ জিনিসগুলো আর হচ্ছে না। এত শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া সু্যোগ হয়তো কোন কাজেই লাগানো গেল নাৃ
অগ্নিশিখা: প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: এটাকে আমি একটা স্মার্ট মূভ মনে করি। আমরা যারাই সরকার গঠন করি, তাদেরই প্রথমে ভারত সফর করতে হবে, তা কেন? ভারতে আমরা যাবো না, তা তো বলিনি। ভারতের সাথে শত্রুতার সম্পর্ক-তো আমরা চাই না। আমারা তাদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক চাই। কিন্তু যে কোন কারনে আমরা যদি মালয়েশিয়ায় যাই তবে দোষের কি?
আমাদের-তো চীনেরও বন্ধুত্ব দরকার, আমেরিকার বন্ধুত্বও আমরা চাইছি।প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের নির্যাসটা এখনও আমাদের কাছে, অন্তত আমার কাছে স্পষ্ট নয়।
আর্থিকভাবে যদি বিবেচনা করি তাহলে মোংলা পোর্ট বিনির্মাণে তারা সহযোগীতা করবে, সেটা একটা ভালো দিক। শি জিন পিং একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায়। তখন তিনি ২০ বিলিয়ন ডলারের কমিটমেন্ট করেছিলেন, তার মধ্যে চার-সাড়েচার বিলিয়ন ডলার ডেসপাচ হয়েছিল। সে ব্যাপারে আর কোন আলাপ হয় নাই। অর্থনীতি বা অন্যান্য সহযোগীতার ক্ষেত্রে কি কি আলোচনা হয়েছে তাও অবশ্য বলা যায় না। বোধহয় ১৫টা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং সই হয়েছে। কেউ কেউ বলছে একটা-দুটা চুক্তিও সই হয়েছে, সেটা অবশ্য স্পষ্ট নয়। চীন থেকে একটা করিডোরের কথা বলা হয়েছে মিয়নমার হয়ে বাংলাদেশ। যদিও করিডোর নিয়ে বাংলাদেশ এখনও স্পষ্ট কোন বক্তব্য দেয়নি।
পদ্মা ব্যারেজের এবং তিস্তা ব্যারেজের ব্যাপারে চীন সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছে বলে বলা হয়েছে। এটা কতটা আশ্বাস আর কতটা কমিটমেন্ট তা আমরা জানিনা। এ ব্যাপারে চীন বাংলাদেশ যৌথ ইশতেহারে কিছু নাই।
শি আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যে যৌথ ঘোষণা এসেছে, সেখানে এমন একটি কথা আছে যে, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্বের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রাখে এবং সম্মান করে। এইটা বাংলাদেশকে এক্সট্রা শক্তি দেয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভয় পায়, শংকা করে তখন তা ব্যালেন্সিং ফ্যাক্টরের কাজ করে।
এই সম্মান, শ্রদ্ধা আবার আন-কন্ডিশনাল নয়। বিনিময়ে তাইওয়ান যে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তা আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এবং সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করতে হয়েছে। ইতিপূর্বে এত ক্লিয়ারলি বলা হয় নাই। বরঞ্চ, বি এন পি সরকার ২০০৪ সালে তাইওয়ানকে ট্রেড সেন্টার খোলার অনুমতি দিয়েছিল।
তারপরও প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে আমি খাঁটো করে দেখব না। বিগত পনেরো বছরের আওয়ামী শাসনামলে বাইল্যাটারাল চুক্তির ক্ষেত্রে আমরা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এরকম অনেক অভিজ্ঞতা আছে, অভিন্ন নদীর পানির ক্ষেত্রে আমরা শেয়ার পাইনি। আমাদের ফারাক্কা, টিপাইমুখ, তিস্তা সমস্যার কোন সমাধান পাইনি। প্রায় ৫৩ টি নদীর প্রবেশমুখে বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিয়েছে ভারত।
এ সমস্ত জায়গায় বাংলাদেশ এখন স্ট্রংগার হবে। সেই সব দিক থেকে এই সফর খুবই পজিটিভ।
অগ্নিশিখা: এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমরা যে চুক্তি করেছি সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ নয় এমন কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তারাষ্ট্রের অবগতি করতে হবে। যেমন আমরা যখন তেল নেব রাশিয়া থেকে তখন আমেরিকান কনসার্ন নিতে হয়েছে। সমরাস্ত্র কেনা এবং বেশ কিছু ট্রেড এর ক্ষেত্রে ওদের কথার বাইরে যাওয়ার উপায় নাই।
কিন্তু চীনের সাথে আমরা যে সহযোগীতার কথা বললাম, সেই সহযোগীতা আমেরিকার সাথের চুক্তিকে অতিক্রম করতে পারে কি না এটা ভবিষ্যতে দেখতে হবে।
এখন পর্যন্ত সরকার এই বিষয়ে কিছু বলেনি। যেমন বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ক্ষেত্রে ভারতের বিরোধীতা ছিল, একভাবে আমেরিকারও বিরোধীতা ছিল। এখন যে চায়না, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ করিডোরের কথা বলা হচ্ছে সেটা বি আর ই নয়, কিন্ত অনেকটা একইরকম। দেখা যাক এটাকে তারা কিভাবে নেয়, এবং বাংলাদেশ কিভাবে এটা হ্যান্ডেল করতে পারে?
একটা প্রশ্ন এসেই যায়, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে আমরা কি বন্ধু তৈরী করলাম বেশি, না শত্রু? না কি বন্ধুত্বের নামে লোক দেখানো কিছু একটা?
চীনের সফরকে একদিকে খুব ভালো বলা যাবে যদি বাংলাদেশ এগুলোকে ঠিকমতো ব্যালেন্স করতে পারে। যদি না করতে পারে সেটা আমাদের জন্য অনেক অস্বস্তির হবে।
অগ্নিশিখা: বাংলাদেশে ঐতিহ্যগত ভাবে যেকোন সফরশেষে একটা কমন প্রশ্ন করা হয়, সেই প্রশ্নের উত্তরে আপনি কি বলবেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: এইখানে আমি আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রী যেভাবে কথা বলেছেন, আমি তার কাছাকাছি থাকব। তিনি বলেছেন, কি পেলাম এমন প্রশ্ন কেন আসবে, আমরা কি ভিক্ষা করতে গিয়েছি? চীন আমাদের টাকা দেবে, এই আশায় আমরা যাইনি। আমরা যে ভরসার জায়গা তৈরী করতে পেরেছি সেটাই বড় কথা।
যদি সত্যি সত্যি এমনটা হয়, চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে সত্যিই কমিটেড থাকে তাহলে বহু ক্ষেত্রেই আমরা শক্ত অবস্থানে থাকব।
আমরা এখনও বর্ডার কিলিং বন্ধ করতে পারিনি, পুশ-ইন চলছেই। যদিও প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর পুশ-ইন খুবই দূর্বল হয়েছে। এটা যে শুধু চীন সফরের জন্যই হয়েছে অমনটা বলব না। কিন্তু তারপরও ভারত সরকার এটা এখন নিশ্চয় বুঝে, পুশ-ইন করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে দূর্বল করার বিষয়টা এখন আর ওয়ার্ক করে না।
জুলাই সনদ, বাজেট, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জনগনের অধিকার প্রশ্নে বিএনপি সরকারের সাথে বিরোধী দলের দরকষাকষি কোন পর্যায়ের বলে মনে করেন?
দরকষাকষি নেই বললেই চলে। জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দল সংসদের বাইরে কিছু কথা বলেছে, কিন্ত সংসদে প্রায় নিশ্চুপ। আমেরিকার সাথে চুক্তি সহ আরও কিছু প্রসঙ্গে সতন্ত্র সাংসদ বিল উত্থাপন করতে পাঁচজন সাংসদের স্বাক্ষর যোগাড় করতে পারেনি। বাজেট নিয়ে কোন সংশোধনী বিরোধী দল দেয় নি। এ তো বিনা বাক্যে মেনে নেয়া। সরকারের কাজগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা সরকারকেই সমৃদ্ধ করে, সেই সাথে সংরক্ষণ করে দেশের স্বার্থ। এর মাধ্যমে বিরোধী দল রক্ষা করতে পারে জনগনের দেয়া পবিত্র ম্যান্ডেটের সম্মান।

আপনার মতামত লিখুন