ঢাকা, বাংলাদেশ    বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা, বাংলাদেশ    বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অগ্নিশিখা

ম্যানেজ সিস্টেমে চলে ফিটনেসবিহীন যানবাহন



ম্যানেজ সিস্টেমে চলে ফিটনেসবিহীন যানবাহন

  "অনুসন্ধানী প্রতিবেদন- ১ম পর্ব"

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর সড়কে নামে হাজারো বাস। অফিসগামী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক—সবাই নির্ভর করেন এসব গণপরিবহনের ওপর। কিন্তু যাত্রীদের বহন করা বাসগুলোর একটি বড় অংশই চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ বা নবায়নহীন ফিটনেস সনদ নিয়ে। কোথাও ক্ষয়প্রাপ্ত টায়ার, কোথাও অকার্যকর ব্রেক, কোথাও ভাঙা দরজা কিংবা বিকল হেডলাইট। তবুও দিনের পর দিন এসব বাস প্রশাসনের নাকের ডগায় নির্বিঘ্নে চলাচল করছে।

সাম্প্রতিক বিআরটিএ'র তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে নিবন্ধিত ৮৬ হাজারের বেশি বাস ও মিনিবাসের মধ্যে প্রায় ৪১ হাজারের ফিটনেস সনদ নবায়ন করা হয়নি। ঢাকায় নিবন্ধিত বাসেরও উল্লেখযোগ্য অংশ আইনগত মেয়াদ অতিক্রম করেছে, যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।


রাজধানীর শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ী, দোলাইপাড়, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান এবং মতিঝিল এলাকায় ঘুরে দেখা যায় অনেক বাস থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। কয়েকটির বডি মরিচা ধরা, জানালার কাচ ভাঙা, দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না। কোথাও চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠানামা করছেন, আবার কোথাও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে বাস। যাত্রী ওঠানামায় যত্রতত্র থামানো হচ্ছে এসব যানবাহন। কিন্তু এসবই হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের নাকের ডগায়। 

ফিটনেসবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র নিয়ে রাস্তায় বেপরোয়া চলাচল করছে কয়েকটি কোম্পানির বাস। কোম্পানিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অনাবিল পরিবহন, সময়, শ্রাবণ, লাব্বাঈক, হিমালয়, মেঘলা, তুরাগ, গাবতলী পরিবহনসহ প্রায় দুই ডজনের মতো কোম্পানির বাস দিনের পর দিন বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে। অথচ তাদের অধিকাংশ গাড়ি ফিটনেসবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ। 

এসব যানবাহনের অধিকাংশ মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণে মাসোয়ারা দিয়ে রাস্তায় চলাচল করে। পাশাপাশি অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলে রাস্তায় ঘটছে যত্রতত্র দুর্ঘটনা বাড়ছে প্রাণহানি। ঢাকা মহানগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় এখন অটোরিকশার রাজত্ব চলছে। কিন্তু এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। 

এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রভাবে রাস্তায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা। 

মাঝেমধ্যে বিআরটিএ লোকদেখানো ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের সাময়িক শাস্তি প্রদান করলেও কিছুদিন পর পুনরায় রাস্তায় নামানো হয় এসব বাস, চালকরাও তাদের কাজ চালিয়ে যায়।

একাধিক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক মালিক নিয়মিত মেরামতের পরিবর্তে সাময়িকভাবে ত্রুটি সারিয়ে বাস রাস্তায় নামিয়ে দেন। এতে খরচ কম হয়, কিন্তু যাত্রীদের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এসময় কয়েকজন চালক জানান ঢাকার রাস্তায় এই গাড়িগুলো চলাচলের জন্য ট্রাফিক পুলিশ, থানা পুলিশ এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের ম্যানেজ করতে হয়। দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা চাঁদা দিতে হয় বলে জানান চালক-হেল্পাররা।

শনিরআখড়া থেকে মতিঝিলগামী এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মী বলেন, অনেক সময় বাসে উঠলেই মনে হয় এটি যে কোনো মুহূর্তে বিকল হয়ে যাবে। কিন্তু বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে চলতে হয়। নারীদের জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা না থাকায় হুড়োহুড়ি করে পুরুষ মানুষের সাথে অনেকটা প্রতিযোগিতা করে গাড়িতে উঠতে হয়। আমাদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। এসময় তিনি বলেন রায়েরবাগ-শনিরআখড়ার মানুষের একমাত্র ভরসা ফিটনেসবিহীন বাস।

কুমিল্লা থেকে আসা এক যাত্রী জানান, কাউন্টার থেকে টিকেট না পাওয়ায় উঠেছিলাম তিশা পরিবহনের একটি বাসে। ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের গাড়িগুলো মূলত দূতগতিতে চলাচল করে কিন্তু এই গাড়িতে উঠে মনে হলো হয়ত: ঢাকা পৌছাতে পারবো না যেকোন সময় দূর্ঘটনার মুখে পড়তে পারি। বাসটি ঢাকা আসতে তিনবার রাস্তায় বিকল হয়ে পরে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হাইওয়ে পুলিশের নাকের ডগায় দিনের পর দিন এ-সব ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো চলাচল করলেও তাদের কোন মাথাব্যথা নেই।  

এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর এসময় ক্ষোভ নিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, ঢাকা রাস্তা এখন অনেকটাই ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দখলে রয়েছে। বড় কোন দূর্ঘটনা না ঘটলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না। আদৌ এই সিস্টেমের পরিবর্তন হবে কি না তা অনিশ্চিত। এই শিক্ষার্থী আরও বলেন "অনেক বাসে ব্রেক ধরলেই বিকট শব্দ হয়। চলন্ত অবস্থায় দরজা খোলা থাকে। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে যাতায়াত করি।

ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা জানায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযানে জরিমানা ও মামলা হলেও কয়েকদিন পর একই বাস আবার সড়কে দেখা যায় বলে অভিযোগ যাত্রী ও সচেতন নাগরিকদের।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান নয়, অবৈধভাবে চলা বাস স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত তদারকি নিশ্চিত না করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। শুধু চালকের দক্ষতা নয়, একটি বাসের যান্ত্রিক সক্ষমতাও নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।

বিআরটিএ অতীতে উচ্চ আদালতে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে রাজধানীর নমুনা জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাসের ফিটনেস সনদ অবৈধ থাকার তথ্য তুলে ধরে এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক থেকে অপসারণের সুপারিশ করে।

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালী মালিকদের চাপ, আইনের অসম প্রয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাই সমস্যাটিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। ফলে অভিযান শেষে কিছুদিন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আগের চিত্র ফিরে আসে।

যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের কাছে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দিনরাত চেষ্টা করেও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না। ফিটনেসবিহীন আর মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র নিয়ে রাস্তায় চলাচল করে এমন একাধিক বাস আটক করে জরিমানা করেছি কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাস কোম্পানির মালিকেরা কিছুদিন না যেতে আবারো বাসগুলো রাস্তায় নামিয়ে দেয়।

ফিটনেসবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র নিয়ে রাস্তায় যানবাহনগুলো কিভাবে চলাচল করছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ডিসি জানান, ট্রাফিক পুলিশ সবসময় কঠোর নজরদারির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে আসছে। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের কোন সুযোগ নেই। মাঝেমধ্যে দু'একটা ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করে কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ তাদের ছাড় দেয় না। আমাদের নজরে আসামাত্র এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় বলে জানান তিনি। 

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হলে কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ করতে হবে। যেমন: ফিটনেসবিহীন বাস স্থায়ীভাবে সড়ক থেকে অপসারণ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস যাচাই ও মনিটরিং, মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা চালু।

রাজধানীর কোটি মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শুধু ঘোষণা বা মাঝে-মধ্যে অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ। অন্যথায় প্রতিদিনের যাত্রাই থেকে যাবে এক অনিশ্চিত ঝুঁকির নাম।

আপনার মতামত লিখুন

অগ্নিশিখা

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ম্যানেজ সিস্টেমে চলে ফিটনেসবিহীন যানবাহন

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬

featured Image

  "অনুসন্ধানী প্রতিবেদন- ১ম পর্ব"

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর সড়কে নামে হাজারো বাস। অফিসগামী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক—সবাই নির্ভর করেন এসব গণপরিবহনের ওপর। কিন্তু যাত্রীদের বহন করা বাসগুলোর একটি বড় অংশই চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ বা নবায়নহীন ফিটনেস সনদ নিয়ে। কোথাও ক্ষয়প্রাপ্ত টায়ার, কোথাও অকার্যকর ব্রেক, কোথাও ভাঙা দরজা কিংবা বিকল হেডলাইট। তবুও দিনের পর দিন এসব বাস প্রশাসনের নাকের ডগায় নির্বিঘ্নে চলাচল করছে।

সাম্প্রতিক বিআরটিএ'র তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে নিবন্ধিত ৮৬ হাজারের বেশি বাস ও মিনিবাসের মধ্যে প্রায় ৪১ হাজারের ফিটনেস সনদ নবায়ন করা হয়নি। ঢাকায় নিবন্ধিত বাসেরও উল্লেখযোগ্য অংশ আইনগত মেয়াদ অতিক্রম করেছে, যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।


রাজধানীর শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ী, দোলাইপাড়, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান এবং মতিঝিল এলাকায় ঘুরে দেখা যায় অনেক বাস থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। কয়েকটির বডি মরিচা ধরা, জানালার কাচ ভাঙা, দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না। কোথাও চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠানামা করছেন, আবার কোথাও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে বাস। যাত্রী ওঠানামায় যত্রতত্র থামানো হচ্ছে এসব যানবাহন। কিন্তু এসবই হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের নাকের ডগায়। 

ফিটনেসবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র নিয়ে রাস্তায় বেপরোয়া চলাচল করছে কয়েকটি কোম্পানির বাস। কোম্পানিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অনাবিল পরিবহন, সময়, শ্রাবণ, লাব্বাঈক, হিমালয়, মেঘলা, তুরাগ, গাবতলী পরিবহনসহ প্রায় দুই ডজনের মতো কোম্পানির বাস দিনের পর দিন বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে। অথচ তাদের অধিকাংশ গাড়ি ফিটনেসবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ। 

এসব যানবাহনের অধিকাংশ মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণে মাসোয়ারা দিয়ে রাস্তায় চলাচল করে। পাশাপাশি অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলে রাস্তায় ঘটছে যত্রতত্র দুর্ঘটনা বাড়ছে প্রাণহানি। ঢাকা মহানগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় এখন অটোরিকশার রাজত্ব চলছে। কিন্তু এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। 

এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রভাবে রাস্তায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা। 

মাঝেমধ্যে বিআরটিএ লোকদেখানো ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের সাময়িক শাস্তি প্রদান করলেও কিছুদিন পর পুনরায় রাস্তায় নামানো হয় এসব বাস, চালকরাও তাদের কাজ চালিয়ে যায়।

একাধিক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক মালিক নিয়মিত মেরামতের পরিবর্তে সাময়িকভাবে ত্রুটি সারিয়ে বাস রাস্তায় নামিয়ে দেন। এতে খরচ কম হয়, কিন্তু যাত্রীদের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এসময় কয়েকজন চালক জানান ঢাকার রাস্তায় এই গাড়িগুলো চলাচলের জন্য ট্রাফিক পুলিশ, থানা পুলিশ এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের ম্যানেজ করতে হয়। দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা চাঁদা দিতে হয় বলে জানান চালক-হেল্পাররা।

শনিরআখড়া থেকে মতিঝিলগামী এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মী বলেন, অনেক সময় বাসে উঠলেই মনে হয় এটি যে কোনো মুহূর্তে বিকল হয়ে যাবে। কিন্তু বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে চলতে হয়। নারীদের জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা না থাকায় হুড়োহুড়ি করে পুরুষ মানুষের সাথে অনেকটা প্রতিযোগিতা করে গাড়িতে উঠতে হয়। আমাদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। এসময় তিনি বলেন রায়েরবাগ-শনিরআখড়ার মানুষের একমাত্র ভরসা ফিটনেসবিহীন বাস।

কুমিল্লা থেকে আসা এক যাত্রী জানান, কাউন্টার থেকে টিকেট না পাওয়ায় উঠেছিলাম তিশা পরিবহনের একটি বাসে। ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের গাড়িগুলো মূলত দূতগতিতে চলাচল করে কিন্তু এই গাড়িতে উঠে মনে হলো হয়ত: ঢাকা পৌছাতে পারবো না যেকোন সময় দূর্ঘটনার মুখে পড়তে পারি। বাসটি ঢাকা আসতে তিনবার রাস্তায় বিকল হয়ে পরে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হাইওয়ে পুলিশের নাকের ডগায় দিনের পর দিন এ-সব ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো চলাচল করলেও তাদের কোন মাথাব্যথা নেই।  

এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর এসময় ক্ষোভ নিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, ঢাকা রাস্তা এখন অনেকটাই ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দখলে রয়েছে। বড় কোন দূর্ঘটনা না ঘটলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না। আদৌ এই সিস্টেমের পরিবর্তন হবে কি না তা অনিশ্চিত। এই শিক্ষার্থী আরও বলেন "অনেক বাসে ব্রেক ধরলেই বিকট শব্দ হয়। চলন্ত অবস্থায় দরজা খোলা থাকে। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে যাতায়াত করি।

ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা জানায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযানে জরিমানা ও মামলা হলেও কয়েকদিন পর একই বাস আবার সড়কে দেখা যায় বলে অভিযোগ যাত্রী ও সচেতন নাগরিকদের।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান নয়, অবৈধভাবে চলা বাস স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত তদারকি নিশ্চিত না করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। শুধু চালকের দক্ষতা নয়, একটি বাসের যান্ত্রিক সক্ষমতাও নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।

বিআরটিএ অতীতে উচ্চ আদালতে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে রাজধানীর নমুনা জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাসের ফিটনেস সনদ অবৈধ থাকার তথ্য তুলে ধরে এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক থেকে অপসারণের সুপারিশ করে।

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালী মালিকদের চাপ, আইনের অসম প্রয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাই সমস্যাটিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। ফলে অভিযান শেষে কিছুদিন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আগের চিত্র ফিরে আসে।

যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের কাছে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দিনরাত চেষ্টা করেও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না। ফিটনেসবিহীন আর মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র নিয়ে রাস্তায় চলাচল করে এমন একাধিক বাস আটক করে জরিমানা করেছি কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাস কোম্পানির মালিকেরা কিছুদিন না যেতে আবারো বাসগুলো রাস্তায় নামিয়ে দেয়।

ফিটনেসবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র নিয়ে রাস্তায় যানবাহনগুলো কিভাবে চলাচল করছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ডিসি জানান, ট্রাফিক পুলিশ সবসময় কঠোর নজরদারির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে আসছে। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের কোন সুযোগ নেই। মাঝেমধ্যে দু'একটা ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করে কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ তাদের ছাড় দেয় না। আমাদের নজরে আসামাত্র এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় বলে জানান তিনি। 

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হলে কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ করতে হবে। যেমন: ফিটনেসবিহীন বাস স্থায়ীভাবে সড়ক থেকে অপসারণ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস যাচাই ও মনিটরিং, মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা চালু।

রাজধানীর কোটি মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শুধু ঘোষণা বা মাঝে-মধ্যে অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ। অন্যথায় প্রতিদিনের যাত্রাই থেকে যাবে এক অনিশ্চিত ঝুঁকির নাম।


অগ্নিশিখা

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মোর্শেদ আলম
সম্পাদক কর্তৃক “তুহিন প্রেস”, ২১৯/২, ফকিরাপুল (১ম গলি), ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় । সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ করিম চেম্বার (৪র্থ তলা) ৯৯ মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।
কপিরাইট © ২০২৬ অগ্নিশিখা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত