মোঃ রকিবুল ইসলাম : সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী (৩৫) ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সিয়াম হোসেন (২২) হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনকে ঘিরে এলাকায় তীব্র আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মামলার কয়েকজন প্রভাবশালী আসামিকে দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং অন্যতম এক আসামির গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই জামিন পাওয়ার ঘটনায় তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এনায়েতপুরের আল-হেরা মার্কেট ও ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সিয়াম হোসেন।
ঘটনার পর নিহত ইয়াহিয়া আলীর স্ত্রী শাহানা খাতুন বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মমিন মণ্ডল, তার ভাই আব্দুল আলিম মণ্ডল, জুবায়ের মণ্ডল ও মো. লুৎফর রহমানসহ ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫০০ থেকে ৭০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এ ছাড়া এনায়েতপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হযরত আলী বাদী হয়ে আব্দুল মমিন মণ্ডলসহ ৮৯ জনের বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি হত্যা মামলা করেন। উভয় মামলার এজাহারেই আসামিদের বিরুদ্ধে হামলার নেতৃত্ব দেওয়া এবং গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
দুই মামলার তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদীরা ব্যক্তিগতভাবে আসামি আব্দুল আলিম মণ্ডল, জুবায়ের মণ্ডল ও মো. লুৎফর রহমানকে চিনতেন না। এ যুক্তিতে তাদের দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলে পরে তারা অব্যাহতি পান।
এদিকে মামলার অন্যতম আসামি জুবায়ের মণ্ডলকে ২০২৫ সালের ১ জুন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হলেও মাত্র তিন দিনের মাথায়, ৪ জুন আদালত তাকে জামিন দেন। হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামির এত দ্রুত জামিন পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মামলার তদন্ত ও আসামিদের অব্যাহতি প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেও দেখা দিয়েছে ভিন্নতা। অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির কর্নেল বলেন, একটি "অন্তর্বর্তীকালীন চার্জশিট পর্যালোচনা কমিটি"র সুপারিশের ভিত্তিতেই কয়েকজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, পিপির প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও ওই কমিটির বৈঠকে তাকে রাখা হয়নি।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম এমন কোনো কমিটির অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করে বলেন, চার্জশিট প্রস্তুত ও আদালতে দাখিল করা সম্পূর্ণ পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব। এ ধরনের কোনো কমিটির বিষয়ে তার জানা নেই।
তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য না করে এনায়েতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে ওসি মো. জাহিদ হোসেনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, অন্তর্বর্তী তদন্তে সংশ্লিষ্ট আসামিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেই তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাদীপক্ষ চাইলে আদালতে নারাজি আবেদন করতে পারেন। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বাদীর নির্দেশেই আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
এদিকে শহীদ পরিবারের সদস্যরা পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই প্রতিবেদনে মনগড়া তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
বাদীপক্ষের ভাষ্য, আমরা যদি আসামিদের না চিনতাম, তাহলে এজাহারে তাদের নাম কেন উল্লেখ করতাম? আব্দুল আলিম মণ্ডল ও জুবায়ের মণ্ডল হুকুমের আসামি ছিলেন, আর লুৎফর রহমান সরাসরি গুলি চালিয়েছেন। অর্থের বিনিময়ে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও পুনঃতদন্ত চাই।
আসামিদের অব্যাহতি এবং দ্রুত জামিনকে কেন্দ্র করে এনায়েতপুর এলাকায় ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত বা আদালতের আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ প্রকাশ না হলেও, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন নিহতদের পরিবার এবং স্থানীয় সচেতন মহল।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬
মোঃ রকিবুল ইসলাম : সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী (৩৫) ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সিয়াম হোসেন (২২) হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনকে ঘিরে এলাকায় তীব্র আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মামলার কয়েকজন প্রভাবশালী আসামিকে দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং অন্যতম এক আসামির গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই জামিন পাওয়ার ঘটনায় তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এনায়েতপুরের আল-হেরা মার্কেট ও ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সিয়াম হোসেন।
ঘটনার পর নিহত ইয়াহিয়া আলীর স্ত্রী শাহানা খাতুন বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মমিন মণ্ডল, তার ভাই আব্দুল আলিম মণ্ডল, জুবায়ের মণ্ডল ও মো. লুৎফর রহমানসহ ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫০০ থেকে ৭০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এ ছাড়া এনায়েতপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হযরত আলী বাদী হয়ে আব্দুল মমিন মণ্ডলসহ ৮৯ জনের বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি হত্যা মামলা করেন। উভয় মামলার এজাহারেই আসামিদের বিরুদ্ধে হামলার নেতৃত্ব দেওয়া এবং গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
দুই মামলার তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদীরা ব্যক্তিগতভাবে আসামি আব্দুল আলিম মণ্ডল, জুবায়ের মণ্ডল ও মো. লুৎফর রহমানকে চিনতেন না। এ যুক্তিতে তাদের দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলে পরে তারা অব্যাহতি পান।
এদিকে মামলার অন্যতম আসামি জুবায়ের মণ্ডলকে ২০২৫ সালের ১ জুন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হলেও মাত্র তিন দিনের মাথায়, ৪ জুন আদালত তাকে জামিন দেন। হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামির এত দ্রুত জামিন পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মামলার তদন্ত ও আসামিদের অব্যাহতি প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেও দেখা দিয়েছে ভিন্নতা। অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির কর্নেল বলেন, একটি "অন্তর্বর্তীকালীন চার্জশিট পর্যালোচনা কমিটি"র সুপারিশের ভিত্তিতেই কয়েকজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, পিপির প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও ওই কমিটির বৈঠকে তাকে রাখা হয়নি।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম এমন কোনো কমিটির অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করে বলেন, চার্জশিট প্রস্তুত ও আদালতে দাখিল করা সম্পূর্ণ পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব। এ ধরনের কোনো কমিটির বিষয়ে তার জানা নেই।
তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য না করে এনায়েতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে ওসি মো. জাহিদ হোসেনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, অন্তর্বর্তী তদন্তে সংশ্লিষ্ট আসামিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেই তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাদীপক্ষ চাইলে আদালতে নারাজি আবেদন করতে পারেন। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বাদীর নির্দেশেই আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
এদিকে শহীদ পরিবারের সদস্যরা পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই প্রতিবেদনে মনগড়া তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
বাদীপক্ষের ভাষ্য, আমরা যদি আসামিদের না চিনতাম, তাহলে এজাহারে তাদের নাম কেন উল্লেখ করতাম? আব্দুল আলিম মণ্ডল ও জুবায়ের মণ্ডল হুকুমের আসামি ছিলেন, আর লুৎফর রহমান সরাসরি গুলি চালিয়েছেন। অর্থের বিনিময়ে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও পুনঃতদন্ত চাই।
আসামিদের অব্যাহতি এবং দ্রুত জামিনকে কেন্দ্র করে এনায়েতপুর এলাকায় ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত বা আদালতের আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ প্রকাশ না হলেও, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন নিহতদের পরিবার এবং স্থানীয় সচেতন মহল।

আপনার মতামত লিখুন