ঢাকা, বাংলাদেশ    বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা, বাংলাদেশ    বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অগ্নিশিখা

ধরাছোঁয়ার বাইরে সীমান্তের মাদক গডফাদাররা



ধরাছোঁয়ার বাইরে সীমান্তের মাদক গডফাদাররা
ছবি: প্রতিনিধি

♦️সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢুকছে লাখ লাখ ইয়াবা

♦️চুনোপুঁটি আটক হলেও অধরা গডফাদাররা 

♦️ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ছে প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারা 

মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান চললেও সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে নিয়ন্ত্রণে আসছে না মরণনেশা ইয়াবা। প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে লাখ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার ও বহনকারীরা আটক হলেও, মাদক কারবারের মূল গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে কক্সবাজার এখন কার্যত ইয়াবা পাচারের অন্যতম বড় রুট ও নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সদস্যরা আড়ালে থেকেই সারা দেশে ইয়াবা পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মূলত বাহক, জেলে কিংবা নিম্নপর্যায়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়।

সম্প্রতি টেকনাফ সীমান্ত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অরক্ষিত সীমান্ত ও সাগরপথ ব্যবহার করে অবাধে ইয়াবা প্রবেশ করছে মিয়ানমার থেকে। সন্ধ্যার পর সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা কার্যত চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফের এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে যারা ইয়াবা কারবার নিয়ন্ত্রণ করে তাদের হাত অনেক লম্বা। তারা প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।”

একজন জেলে জানান, সাগরে অভিযান চালিয়ে ট্রলারে থাকা জেলেদের আটক করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ট্রলার মালিক বা মূল গডফাদাররা থেকে যায় আড়ালে। তিনি বলেন, “মাঝে মাঝে অভিযান হয়, ইয়াবাও উদ্ধার হয়। কিন্তু যাদের নির্দেশে এসব চালান আসে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।”

তিন বছর আগে কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ আটক হওয়া এক জেলের স্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, তার স্বামী কেবল দৈনিক হাজিরায় মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রলারে ইয়াবা পাওয়ার পর জেলেরা কারাগারে গেলেও প্রকৃত মালিক রহস্যজনকভাবে মামলা থেকে রেহাই পান। একইভাবে আরও অনেক জেলে বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে বন্দী থাকলেও মূল হোতারা বহাল তবিয়তে রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ইয়াবা পাচারের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যও জড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি রামুর মরিচ্যা বিজিবির যৌথ চেকপোস্টে ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এপিবিএনের এক কনস্টেবল আটক হন। চট্রগ্রামে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আরেক পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার এমন ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

এদিকে ইয়াবা পাচারের নতুন রুট হিসেবে উঠে এসেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সোনাইছড়ি এলাকা। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ঘন জঙ্গল ও সীমিত নজরদারির সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা এই রুট ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।

রামু থেকে সোনাইছড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাচারকারীরা নিজেরাই তৈরি করেছে একাধিক গোপন পথ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল না থাকায় এসব পথ ব্যবহার করে সহজেই ইয়াবার চালান প্রবেশ করছে কক্সবাজার ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রামুর খুনিয়া পালং এলাকা বর্তমানে ইয়াবা মজুদের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রথমে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়িতে রাখা হয়। পরে সুবিধাজনক সময়ে সেগুলো রামুর বিভিন্ন নিরাপদ আস্তানায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

র‌্যাব-১৫ এর কর্মকর্তারা জানান, মাদক নির্মূলে তারা জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় ইয়াবার চালান জব্দ করা হয়েছে এবং গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) অহিদুর রহমান অগ্নিশিখা কে বলেন, “কক্সবাজারকে মাদকমুক্ত করতে জেলা পুলিশের সব ইউনিট একযোগে কাজ করছে। বিভিন্ন চেকপোস্টে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং বড় বড় চালান উদ্ধার হচ্ছে।”

গডফাদাররা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে যে কাউকেই আইনের মুখোমুখি করা হবে।”

স্থানীয়রা জানান , সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ইয়াবা নির্মূল সম্ভব হবে না।

আপনার মতামত লিখুন

অগ্নিশিখা

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ধরাছোঁয়ার বাইরে সীমান্তের মাদক গডফাদাররা

প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬

featured Image

♦️সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢুকছে লাখ লাখ ইয়াবা

♦️চুনোপুঁটি আটক হলেও অধরা গডফাদাররা 

♦️ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ছে প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারা 

মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান চললেও সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে নিয়ন্ত্রণে আসছে না মরণনেশা ইয়াবা। প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে লাখ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার ও বহনকারীরা আটক হলেও, মাদক কারবারের মূল গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে কক্সবাজার এখন কার্যত ইয়াবা পাচারের অন্যতম বড় রুট ও নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সদস্যরা আড়ালে থেকেই সারা দেশে ইয়াবা পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মূলত বাহক, জেলে কিংবা নিম্নপর্যায়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়।

সম্প্রতি টেকনাফ সীমান্ত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অরক্ষিত সীমান্ত ও সাগরপথ ব্যবহার করে অবাধে ইয়াবা প্রবেশ করছে মিয়ানমার থেকে। সন্ধ্যার পর সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা কার্যত চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফের এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে যারা ইয়াবা কারবার নিয়ন্ত্রণ করে তাদের হাত অনেক লম্বা। তারা প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।”

একজন জেলে জানান, সাগরে অভিযান চালিয়ে ট্রলারে থাকা জেলেদের আটক করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ট্রলার মালিক বা মূল গডফাদাররা থেকে যায় আড়ালে। তিনি বলেন, “মাঝে মাঝে অভিযান হয়, ইয়াবাও উদ্ধার হয়। কিন্তু যাদের নির্দেশে এসব চালান আসে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।”

তিন বছর আগে কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ আটক হওয়া এক জেলের স্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, তার স্বামী কেবল দৈনিক হাজিরায় মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রলারে ইয়াবা পাওয়ার পর জেলেরা কারাগারে গেলেও প্রকৃত মালিক রহস্যজনকভাবে মামলা থেকে রেহাই পান। একইভাবে আরও অনেক জেলে বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে বন্দী থাকলেও মূল হোতারা বহাল তবিয়তে রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ইয়াবা পাচারের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যও জড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি রামুর মরিচ্যা বিজিবির যৌথ চেকপোস্টে ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এপিবিএনের এক কনস্টেবল আটক হন। চট্রগ্রামে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আরেক পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার এমন ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

এদিকে ইয়াবা পাচারের নতুন রুট হিসেবে উঠে এসেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সোনাইছড়ি এলাকা। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ঘন জঙ্গল ও সীমিত নজরদারির সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা এই রুট ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।

রামু থেকে সোনাইছড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাচারকারীরা নিজেরাই তৈরি করেছে একাধিক গোপন পথ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল না থাকায় এসব পথ ব্যবহার করে সহজেই ইয়াবার চালান প্রবেশ করছে কক্সবাজার ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রামুর খুনিয়া পালং এলাকা বর্তমানে ইয়াবা মজুদের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রথমে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়িতে রাখা হয়। পরে সুবিধাজনক সময়ে সেগুলো রামুর বিভিন্ন নিরাপদ আস্তানায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

র‌্যাব-১৫ এর কর্মকর্তারা জানান, মাদক নির্মূলে তারা জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় ইয়াবার চালান জব্দ করা হয়েছে এবং গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) অহিদুর রহমান অগ্নিশিখা কে বলেন, “কক্সবাজারকে মাদকমুক্ত করতে জেলা পুলিশের সব ইউনিট একযোগে কাজ করছে। বিভিন্ন চেকপোস্টে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং বড় বড় চালান উদ্ধার হচ্ছে।”

গডফাদাররা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে যে কাউকেই আইনের মুখোমুখি করা হবে।”

স্থানীয়রা জানান , সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ইয়াবা নির্মূল সম্ভব হবে না।


অগ্নিশিখা

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মোর্শেদ আলম
সম্পাদক কর্তৃক “তুহিন প্রেস”, ২১৯/২, ফকিরাপুল (১ম গলি), ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় । সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ করিম চেম্বার (৪র্থ তলা) ৯৯ মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।
কপিরাইট © ২০২৬ অগ্নিশিখা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত