উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
এম.আর.জে শান্ত, বিনোদন প্রতিবেদক ||
ঢাকাই সিনেমার পর্দায় চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা চরিত্রে দেখা গেছে যুগান্তর চাকমাকে। কখনো স্মাগলার, কখনো খলনায়কের সহযোগী, আবার কখনো মার্শাল আর্ট জানা দুর্ধর্ষ চরিত্রে। ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনেও নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন তিনি। ফাইট পরিচালনা, উইং চুন মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ—এক জীবনে নানা পরিচয়ে কাজ করেছেন এই শিল্পী। চলচ্চিত্র অঙ্গনে অবশ্য নিজের আসল নামের চেয়ে ‘চাইনিজ’ নামেই বেশি পরিচিত তিনি।যুগান্তর চাকমার চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু ১৯৮৪ সালে নির্মাতা নূর হোসেন বলাইয়ের ‘ইন্সপেক্টর’ সিনেমার মাধ্যমে। এরপর নিয়মিতই কাজ করেছেন খল চরিত্রে। প্রায় চারশ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। বেশির ভাগ ছবিতে তাঁর চরিত্র ছিল স্মাগলার কিংবা মূল খলনায়কের সহযোগী। ফলে দর্শকের কাছেও একটা সময় স্মাগলার চরিত্রের অভিনেতা হিসেবেই আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়। তবে নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের কথা বলতে গিয়ে ‘ইন্সপেক্টর’, ‘লড়াকু’, ‘সন্ত্রাস’ ও ‘মায়ের হাতের বালা’ সিনেমাকে বিশেষভাবে মনে করেন তিনি। ‘মায়ের হাতের বালা’য় শাকিব খানের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন।‘চাইনিজ’ নামটিও তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আসল নাম যুগান্তর চাকমা হলেও এই নামটি দিয়েছিলেন তাঁর মার্শাল আর্টের ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম। পরে চলচ্চিত্রের মানুষজনও তাঁকে চাইনিজ নামেই ডাকতে শুরু করেন। এখন এই নামেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।মার্শাল আর্টের সঙ্গে তাঁর যুক্ত হওয়ার গল্পটিও দীর্ঘ। ১৯৯০ সালে ব্ল্যাকবেল্ট অর্জন করেন যুগান্তর। তাঁর ওস্তাদ ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। পরে ওস্তাদের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন। সেই প্রশিক্ষণই পরবর্তী সময়ে তাঁকে চলচ্চিত্রের অ্যাকশন জগতের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে।চাইনিজ বলেন, ‘১৯৯০ সালে আমি মার্শাল আর্টে ব্ল্যাকবেল্ট প্রাপ্ত হই। আমার ওস্তাদ ছিলেন ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম। পরে তাঁর সহকারী ছিলাম।’অভিনয়ের পাশাপাশি ফাইট পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বাড়ে। ‘মা তোকে সালাম’, ‘খুনি শিকদার’, ‘দেনমোহর’, ‘লেডি ইন্সপেক্টর’, ‘বিশাল হাঙ্গামা’, ‘ডাকু রানি’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রের অ্যাকশন দৃশ্যের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। ‘মেয়ে নাম্বার ওয়ান’ সিনেমাতেও ফাইট পরিচালনা করেছেন চাইনিজ। অ্যাকশননির্ভর এই ছবিতে জয়া চৌধুরী ও শাহরিয়াজ অভিনয় করেন।একপর্যায়ে শুধু অভিনয় আর ফাইট পরিচালনায় থেমে থাকেননি চাইনিজ, চলচ্চিত্র নির্মাণেও যুক্ত হয়েছেন। ‘চায়না মামা’, ‘নবীন বাই দ্য টাইগার’, ‘সুপার হিরো’ ও ‘ওস্তাদজি’—এই চারটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত তিনি। এর মধ্যে ‘চায়না মামা’ ও ‘নবীন বাই দ্য টাইগার’-এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ‘চায়না মামা’য় পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন নতুন প্রজন্মের মিথিলা। খল চরিত্রে আছেন শানু শিবা।নির্মাতা হিসেবে চাইনিজের আরেকটি কাজ ‘বাঘিনী’। জয়া চৌধুরীকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে নির্মিত এই সিনেমায় অ্যাকশন ও মার্শাল আর্টকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ছবিটির নির্মাণের সময় চাইনিজ জানিয়েছিলেন, নারীপ্রধান গল্পের সঙ্গে অ্যাকশনের সমন্বয়েই তৈরি হচ্ছে ‘বাঘিনী’। তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মেসার্স যুগান্তর চলচ্চিত্রের ব্যানারেই ছবিটির কাজ এগিয়েছিল।মূলধারার চলচ্চিত্রের পাশাপাশি চাকমা ভাষার চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন চাইনিজ। ‘নুও স্ববন’ নামে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ফলে তাঁর কাজের পরিধি শুধু ঢাকাই সিনেমায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির চলচ্চিত্রের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন।অভিনয় ও ফাইট পরিচালনার পাশাপাশি উইং চুন মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করছেন যুগান্তর চাকমা চাইনিজ। দীর্ঘদিনের মার্শাল আর্ট অনুশীলন এবং চলচ্চিত্রের অ্যাকশন দৃশ্য নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে এই জায়গায় আলাদা পরিচয় দিয়েছে। পর্দায় একজন অভিনেতা হিসেবে লড়াইয়ের দৃশ্যে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে অন্য শিল্পীদের জন্য সেই দৃশ্য তৈরি করা—দুই অভিজ্ঞতাই রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।দীর্ঘ ক্যারিয়ারের এই সময়ে এসেও কাজ থামিয়ে রাখেননি চাইনিজ। বর্তমানে নতুন বেশ কিছু কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন তিনি। এর মধ্যে ঈদের নাটক ‘এই মন জানে’, ‘টাকার বউ ২’ ও ‘লাভ ৯৬’ দর্শকের সামনে এসেছে। শাওমির একটি বিজ্ঞাপনেও দেখা গেছে তাঁকে।নতুন কাজের তালিকায় ফাইট পরিচালনার ব্যস্ততাও রয়েছে। সিমি ইসলাম কলির ‘বাসর হবে মাটির ঘরে’ ও ‘সিনহা’ চলচ্চিত্রে ফাইট পরিচালনা করছেন তিনি। শামীম আলমের ‘শিফু দ্য টাইগার’-এ ফাইট পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে কাজ করছেন। এ আর মুকুল নেত্রবাদীর ‘দুই ওস্তাদ’ ওয়েব ফিল্মেও একই সঙ্গে ফাইট পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে যুক্ত আছেন।১৯৮৪ সালে ‘ইন্সপেক্টর’ দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, চার দশকের বেশি সময় পরও সেই পথচলা থামেনি। একসময় সিনেমার পর্দায় স্মাগলার কিংবা খলনায়কের সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া যুগান্তর চাকমা চাইনিজ এখন নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছেন অভিনয়, ফাইট পরিচালনা, মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ ও চলচ্চিত্র নির্মাণে। পর্দার সামনে ও পেছনে—দুই জায়গাতেই কাজ করে যাওয়া এই শিল্পীর ক্যারিয়ারে তাই ‘চাইনিজ’ নামটি এখন শুধু একটি ডাকনাম নয়, দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রারই একটি পরিচিতি।