উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
অগ্নিশিখা অনলাইন ||
আব্দুল্লাহ-আল-মোমিন : পাবনার ফরিদপুর উপজেলার পুঙ্গলী ইউনিয়নের রতনপুর এলাকায় বড়াল নদীর তীরবর্তী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সরকারি জমি অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের তীর জেলে সুজন ওরফে 'মাটি সুজন' এর দিকে। একই সঙ্গে বছরের পর বছর সরকারি জমি দখল ও বসতি গড়ে উঠলেও তা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, সরকারি এই জমিতে গড়ে ওঠা ৫০টিরও বেশি বসতবাড়ির বাসিন্দাদের কাছে জমি বিক্রির নামে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে। অথচ জমিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন নয়, বরং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্পত্তি।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বড়াল নদীর তীরবর্তী পাউবোর জমি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রির আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে। অনেক পরিবার বসতবাড়ি নির্মাণ করে সেখানে বসবাস শুরু করলেও পরে জানতে পারেন, তারা যে জমি কিনেছেন বলে মনে করেছিলেন, সেটি আসলে সরকারি সম্পত্তি। ফলে এখন তারা একদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে উচ্ছেদের আশঙ্কায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী বলেন, আমরা বিশ্বাস করেই জমি কিনেছিলাম। পরে জানতে পারি এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি। এখন টাকা হারানোর পাশাপাশি মাথার ওপর থাকা ঘরটিও হারানোর ভয় কাজ করছে।এলাকার সচেতন মহলের অভিযোগ, সরকারি সংস্থার জমিতে একের পর এক বসতবাড়ি নির্মাণ হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সময়মতো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নিয়মিত নজরদারি, উচ্ছেদ অভিযান কিংবা কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না থাকায় সরকারি জমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।স্থানীয়রা আরো অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর গভীর রাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটার সময় মাটিচাপায় পড়ে বহাত সরদারের ছেলে মাজন সরদারের মৃত্যু হয় এবং আরও দুইজন গুরুতর আহত হন।অভিযোগকারীদের দাবি, ঘটনাটিকে সে সময় পারিবারিক দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং প্রকৃত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন ফরিদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) যথাযথ তদন্তের পরিবর্তে ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন, পরে তিনি অন্যত্র বদলি হন।স্থানীয়দের দাবি, মাজন সরদারের মৃত্যুর ঘটনাটি পুনরায় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। প্রয়োজনে মরদেহ উত্তোলন (এক্সহিউমেশন) করে পুনরায় ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হোক।রাজনৈতিক প্রভাব, মাদক ও নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল ব্যবসার অভিযোগ স্থানীয়দের, ওই ঘটনার পর থেকেই মাটি সুজন এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবে আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি পূর্ববর্তী রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এলাকায় নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল তৈরির কারখানা পরিচালনা এবং এসবের মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এই প্রভাব ও অর্থের জোরেই তিনি সরকারি জমি বিক্রির মতো দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলে সুজন ওরফে মাটি সুজন বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা আমি বিক্রি করিনি। আপনারা এলাকায় এসে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলেই প্রকৃত ঘটনা জানতে পারবেন।তিনি আরও দাবি করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা স্ট্যাম্প করে বিক্রি করেছে রেজাউল নামের একজন। এখন সেই দায় আমার ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগের কোনো পদে ছিলাম না।তবে একই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে, তাদের প্রায় সবাই আমার হাতে মার খেয়েছে। রতনপুরের বর্তমান নেতাদের মধ্যেও অনেকেই আমার হাতে মার খেয়েছে।তার এই বক্তব্যকে স্থানীয়রা এলাকায় নিজের প্রভাব ও আধিপত্যের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।ফরিদপুর উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ডেমরা পাউবো শাখা) রাজীব হোসাইন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। কিন্তু স্থানীয়রা মাটি সুজনের ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাননি। আমাদের জায়গার ওপর একটি নতুন ঘর নির্মাণ হতে দেখেছি। এছাড়া সেখানে অন্তত ৫০টির বেশি বসতবাড়ি রয়েছে। এর আগেও সুজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং সেই মামলাটি এখনও আদালতে বিচারাধীন। বর্তমান অভিযোগের বিষয়েও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তবে এখানেই দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি জমিটি সরকারি সম্পত্তি হয়, যদি এর আগেও একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়ে থাকে, তাহলে বছরের পর বছর কীভাবে সরকারি জমিতে অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি গড়ে উঠল?সরকারি জমি রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নজরদারিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা হয়েছে কি না, এসব প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমি দখল ও বিক্রির বিষয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এত বিপুলসংখ্যক স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হতো না।এলাকাবাসী জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি জমি দখল ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।