উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে নিখোঁজের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়াবহ জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য। সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে সৎ মা কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ গুম করার অভিযোগ উঠেছে সৎ ছেলে ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রায় দুই বছর পর চাঞ্চল্যকর এই হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে সিআইডি।জানা যায়, ২০১২ সালের দিকে বিধবা কমলা খাতুন দ্বিতীয়বারের মতো সংসার জীবন শুরু করেন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। দু’জনেরই এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। তাদের সংসারে জন্ম নেয় একমাত্র ছেলে নোমান। আবুল কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের পাঁচ ছেলের মধ্যে বর্তমানে তিনজন জীবিত রয়েছেন।পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাস করলেও আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। তদন্তে জানা যায়, মৃত্যুর আগে আবুল কালাম আজাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন ও শিশু ছেলে নোমানের নামে বসতভিটাসহ প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দেন। বর্তমানে যার বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা।এই সম্পত্তি নিজেদের দখলে নিতে প্রথম সংসারের সন্তানদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বিশেষ করে সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে সম্পত্তি নিজেদের নামে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কমলা খাতুনকে বিভিন্নভাবে চাপ দেন। পরবর্তীতে জমি বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি নিয়েও বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।নিখোঁজের নাটক২০২৪ সালের ১০ মার্চ সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর সোনাইমুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ৯ মার্চ থেকে তাদের সৎ মা নিখোঁজ রয়েছেন এবং তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।খবর পেয়ে কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগম ছুটে আসেন। তিনি সৎ ছেলে সাগর ও সাইফুল ইসলাম রাজুর কাছে বোনের খোঁজ জানতে চাইলে তারাও কিছু জানেন না বলে দাবি করেন এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেন।তবে তাদের কথায় সন্দেহ দেখা দিলে রহিমা বেগম ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাগর, রাজু, শ্যামলী ও কাজলকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।প্রথমে ডিবি নোয়াখালীকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হলেও পরে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্যসিআইডির তদন্তে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে অভিযুক্তরা কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানকে মারধর করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এরপর থেকেই মা-ছেলেকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।তদন্ত চলাকালে কমলা খাতুনের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে সিআইডি। জিজ্ঞাসাবাদে মোবাইল ব্যবহারকারী জানান, ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল।পরবর্তীতে তদন্তে জানা যায়, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুল ইসলাম রাজু একসময় ওই বাসাতেই ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন। এরপরই তদন্তে নতুন মোড় নেয়।গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক হত্যার বর্ণনাদীর্ঘ তদন্ত ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার ভাটিকাশর এলাকা থেকে সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজুকে গ্রেফতার করে সিআইডি।পরদিন ২২ মে সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে জিয়াউর রহমান সাগর এবং সহযোগী আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেফতার করা হয়।আদালতের অনুমতিতে তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ তথ্য স্বীকার করেন।তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ঘটনার প্রায় ১৫ দিন আগেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগে থেকেই একটি গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়।২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের খাবারের পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে তারা অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্তরা ঘরে প্রবেশ করে গলায় গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে এবং বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে মা ও শিশুপুত্রকে হত্যা করে।হত্যার পর আলামত নষ্ট করতে তাদের পরনের কাপড় খুলে ফেলে লাশ দুটি পূর্বপ্রস্তুত গর্তে পুঁতে রাখা হয়। পরে ব্যবহৃত গামছা ও কাপড় পুড়িয়ে ফেলা হয়।পুকুর সেচে উদ্ধার দেহাবশেষগ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৪ মে সকালে সিআইডির একটি দল স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে সন্দেহভাজন পুকুরটি সেচ দিয়ে ভেকুর সাহায্যে খনন অভিযান চালায়।এসময় কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। পরে সুরতহাল শেষে দেহাবশেষ ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।আদালতে স্বীকারোক্তিগ্রেফতারকৃত তিন অভিযুক্ত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি নোয়াখালী ইউনিট। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।