উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
অগ্নিশিখা অনলাইন ||
খুলনা প্রতিনিধি : খুলনার অন্যতম প্রবেশদ্বার গল্লামারী ময়ূর নদীর ওপর নির্মাণাধীন দৃষ্টিনন্দন স্টিল নেটওয়ার্ক আর্চ ব্রিজের মূল স্ট্রাকচারের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে ব্রিজের দুই পাশে অস্থায়ী পিলার ও স্প্যান বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই অস্থায়ী স্প্যানের ওপরেই স্টিল নেটওয়ার্ক আর্চের সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মূল স্ট্রাকচার বসানো শেষ হলে অস্থায়ী স্প্যান সরিয়ে ফেলা হবে। আগামী জুন অথবা জুলাই মাসে ব্রিজটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চলমান থাকায় নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। স্টিল ব্রিজের নামে প্রায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা নির্মাণকাজের কারণে গল্লামারী এলাকায় দুই পাশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকতে হচ্ছে।প্রকল্পের মেয়াদ তিন দফায় বাড়িয়ে পাঁচ বছরে উন্নীত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং ধীরগতির কাজের কারণেই প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, এই সেতুর মূল স্ট্রাকচার নির্মাণে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত উন্নতমানের স্টিল ও নাট-বল্টু ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তাও রয়েছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত কাজ শেষ করে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হবে এবং খুলনার প্রবেশদ্বার হিসেবে গল্লামারীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি যানজটমুক্ত হবে।আর্চ স্টিল সেতুকে শক্তিশালী করার জন্য টাইবার ব্যবহার করা হয়। এই সেতু কেবল চাপই বহন করে না, বরং অনুভূমিক চাপও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়। মূল সড়ক থেকে প্রায় সাড়ে চার ফুট উঁচু হবে নতুন স্টিল স্ট্রাকচার। স্টিলের খণ্ডাংশগুলোকে একত্রিকরণ সেতুর পশ্চিম পাশে সড়কের ওপর প্রায় ৪০ ফুট উঁচু এবং ৮০ মিটার দীর্ঘ একটি অস্থায়ী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। ওই প্ল্যাটফর্মের ওপরই স্টিলের খণ্ডাংশগুলো একত্রিত ও সংযোজনের কাজ চলছে। সংযোজন সম্পন্ন হওয়ার পর পুরো স্টিল স্ট্রাকচারটি হাইড্রোলিক জ্যাক বা শক্তিশালী যন্ত্রের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নির্ধারিত স্থানে বসানো হবে। এরপর অস্থায়ী পিলার ও স্প্যান সরিয়ে নেওয়া হবে।প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মূলত করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্রিজ নির্মাণে বিলম্ব হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের প্রযুক্তিগত কাজে দেশীয় প্রকৌশলীদের পূর্ব অভিজ্ঞতা কম থাকায় ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে ভারতীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ভারতীয় কনসালটেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে। সেতু নির্মাণে একাধিক ঠিকাদার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। নির্মাণকাজে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ ধরনের হাইড্রোলিক জ্যাক ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া গত বছরের অতিবৃষ্টির কারণেও প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়।ব্রিজের নির্মাণে সময় বেশি লেগেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রিজের দুই পাশে অ্যাবাটমেন্টের ওপর মূল সেতুর স্টিল স্ট্রাকচার স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মাঝখানে অস্থায়ী পিলার এবং স্প্যানের ওপর টিনের চিলান বসিয়ে তার ওপর স্টিলের খণ্ডাংশগুলো একত্রিকরণ ও সংযোজনের কাজ চলছে। প্রকল্পের ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার এসএম রফিক জানান, ভালোভাবেই কাজ এগিয়ে চলছে। ব্রিজটি দৃশ্যমান হওয়ার আগে অনেকগুলো কাজ চ্যালেঞ্জ ছিল। স্টিল স্ট্রাকচারের সম্পূর্ণ মালামাল দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়েছে। আমাদের খুব সতর্কতার সঙ্গে কাজগুলো করতে হচ্ছে। আশা করি জুন মাসে পুরো স্টিল স্ট্রাকচার দৃশ্যমান হবে। জুলাই মাসে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে আমরা কাজ করব।খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর হক জানান, অনেক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে অবশেষে শহরের প্রবেশমুখ দেখতে যাচ্ছে নান্দনিক এই ব্রিজটি। নানা কারণে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এরপরও নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া হয়। ভারত থেকে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কাজ শুরু করা হয়েছে। আমরা জুলাই মাসে একটি ব্রিজ চালু করতে পারব। এরপর আরেকটির সংযোগও হবে।২০২১ সালে ময়ূর নদীর ওপর গল্লামারী এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের উদ্যোগে দৃষ্টিনন্দন স্টিল নেটওয়ার্ক আর্চ ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। ২০২২ সালের ৫ নভেম্বর থেকে পুরোনো সেতুটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ব্রিজ দুটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা সম্ভব হয়নি। পশ্চিমা প্রযুক্তির জটিলতা, নির্মাণ ব্যয়ের তারতম্য ও ডিজাইন-সংক্রান্ত সমস্যার পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, দীর্ঘস্থায়ী করোনা পরিস্থিতি এবং ভারতীয় কনসালটেন্ট নিয়োগজনিত কারণে প্রকল্পটি বারবার সময়সীমার চাপে পড়ে। বর্তমানে খুলনা সড়ক বিভাগের অধীনে কাজ চলছে। প্রকল্প পরিচালক মো. তানভীর হক যোগদানের পর আলোচনার মুখে আসে গল্লামারী ব্রিজ। খুলনা সড়ক বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এখন প্রকল্পটি দৃশ্যমান রূপ পাচ্ছে। দুটি ব্রিজ নির্মাণে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৮২ কোটি টাকার দাবি তোলে। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী দুটি ব্রিজের ব্যয় ৫৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং আরও ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। যদিও সময়সীমা আরও বৃদ্ধির আলোচনা রয়েছে, তবুও নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে দ্রুত একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ দেখতে আশাবাদী খুলনাবাসী।