উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
অগ্নিশিখা অনলাইন ||
পাবনা প্রতিনিধিঃ পাবনায় ক্ষতিপূরণ না দিয়েই ঘাট ইজারা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিআইডব্লিউটিএ’র বিরুদ্ধে। পাবনা বেড়া পৌরসভার বৃশালিখা মহল্লায় বৃশালিকা কোলঘাট এলাকার জমির মালিক দাবিদাররা এমনটাই অভিযোগ করেছেন। ভুক্তভোগীদের দাবী জমি অধিগ্রহণের নোটিশ বা ক্ষতিপূরণ না দিয়েই ইজারা দেওয়া হয়েছে এই ঘাট। পাবনা বেড়া পৌরসভার বৃশালিখা মহল্লায় বৃশালিকা কোলঘাট একটি ঐতিহ্যবাহী নদীঘাট ও বাজার, যা প্রায় ১০০ বছর আগে এ অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষি পন্য বাজারজাত করার জন্য স্থানীয় জমির মালিকদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল।বৃশালিখা মহল্লা ইছামতি ও হুরাসাগর নদীর মাঝখানে অবস্থিত একটি নদীবিধৌত জনপদ। এ অঞ্চলের উৎপাদিত কৃষিপণ্য উত্তরবঙ্গে বাজার জাতকরণের একমাত্র কেন্দ্র হচ্ছে বেড়াবাজার যার প্রবেশদার হচ্ছে বৃশালিকা কোলঘাট। এই ঘাটের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটি কোনো সরকারি খাস জমি বা ইজারাকৃত সম্পদের উপর গড়ে উঠার পরিবর্তে তা গড়ে উঠেছিল ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর। জমির মালিকরা তাদের জমির একাংশ বাজার ও ঘাটের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং বিনিময়ে তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভাড়া বাবদ কিছু আর্থিক সুবিধা নিতেন। এটি ছিল একটি স্থানীয় সামাজিক চুক্তি, যেখানে জমির মালিক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে লাভবান হতেন বলে জানান স্থানীয়রা। বংশ পরম্পরায় এই ব্যবস্থাপনা চলে আসছিল বলে জানান স্থানীয় ষাট-উর্ধ প্রবীণ বাসিন্দা মোঃ শোভন । বৃশালিকা কোলঘাটের এই ঐতিহ্যবাহী ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থাপনাটি ২০০৮ সালে এক বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হয়। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রেও পরিবর্তন আসায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর ছোট ভাই এবং বেড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র মোঃ আব্দুল বাতেন এই অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে যে, আব্দুল বাতেন ২০০৮ সাল থেকে বৃশালিকা কোলঘাট সহ সংলগ্ন এলাকার সকল ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে হুরাসাগর নদীর তীর ঘেষে মাটি ভরাট করে স্থাপনা তৈরী করে নিজ মালিকানাধীন নদী বন্দরে পরিবর্তিত করেন, এবং যদিও বৃশালিখা মহল্লার অদুরেই বাঘাবাড়ি নৌ-বন্দরের মাধ্যমে বিভিন্ন সিমেন্ট কোম্পানীর সিমেন্ট উত্তরবঙ্গে সরবরাহ করা হতো, তথাপি আব্দুল বাতেন প্রভাব খাটিয়ে বাঘাবাড়ি বন্দরের পরিবর্তে সিমেন্ট বৃশালিখা ঘাটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহে বাধ্য করেন এবং বিনিময়য়ে অর্থ আদায় শুরু করেন। এই সংগৃহীত অর্থের সামান্য অংশ তার অনুগত কিছু জমির মালিককে প্রদান করলেও সিংহভাগ জমির মালিককে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হয়। এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই হামলা ও মামলার কারনে তাদের এলাকা ছাড়া হতে হতো বলে জানান স্থানীয়রা। প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল কাদের চাঁদ এবং সেতু প্রামাণিকের মতো ব্যক্তিরা এই রাজনৈতিক নির্যাতনের জীবন্ত সাক্ষী, যারা দীর্ঘ ১৬ বছর (২০০৮-২০২৪) ধরে তাদের পৈতৃক সম্পত্তির ওপর কোনো অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি।২০২৪ সালে আব্দুল বাতেন তার এই দখলদারিত্বকে আইনি আবরণে ঢাকার জন্য বিআইডব্লিউটিএ (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ)-এর কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে এই কোলঘাটকে সরকারি টেন্ডারের আওতায় নিয়ে আসেন এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জন্য বেড়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ নজরুল ইসলামের নামে কোটি টাকার ঘাট- মাত্র দশ লক্ষ টাকায় ইজারা নেন। সরকারি ইজারা হিসেবে দেখিয়ে নজরুল ইসলামের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ পুনরায় আব্দুল বাতেনের সিন্ডিকেটের কাছেই চলে যেত। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিআইডব্লিউটিএ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জন্য বৃশালিকা কোলঘাটের পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করে। এই নতুন ইজারা প্রক্রিয়ায় এক চমকপ্রদ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১০লক্ষ টাকার বৃশালিকা কোলঘাট ১ কোটি ৭২ লক্ষ টাকায় সর্বচ্চ কর দাতা হিসেবে ইজারা পান মির্জা মেহেদি হাসান।জমির মালিক দাবীদার মোঃ আশরাফুল ইসলামের ভাষ্যমতে রাজনৈতিক ইজারার কারণে জমির ভারা বাবদ প্রাপ্ত অর্থ প্রাপ্তি থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। জমির মালিক দাবীদার আব্দুল কাদের চাঁদ বলেন বিআইডব্লিউটিএ আমাদের জমি হুকুম দখল না করেই ঘাট হিসেবে ইজারা দিয়েছেন, আমাদের জমির ভাড়া বা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন না। জমির সকল দলিল প্রদর্শন করে মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন আমার কাছে সকল রেকর্ড ও খাজনা খারিজের কাগজ আছে তাহলে কিভাবে বিআইডব্লিউটিএ আমদের জমি হুকুম দখলের নোটিশ না দিয়েই জমি ইজারা দিয়েছেন। এ অভিযোগ আশরাফ, রফিক, টুটুল সহ সকল জমির মালিকদের। জমির মালিকগণ তাদের জমির মালিকানার দলিল-পত্র নিয়ে উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি দলিলাদি যাচাই পূর্বক জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দাবি বৈধ বলে অভিমত ব্যক্ত করেন এবং সিরাজগঞ্জ জেলার বাঘাবাড়ি বন্দর কতৃপক্ষের সাথে যোগযোগের পরামর্শ দেন। জমির মালিকগণ দলিল পত্র নিয়ে বাঘাবাড়ি বন্দর কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জমির কাগজপত্র রেখে দেন এবং বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের তরফ হতে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস দিলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ইজারাদার মির্জা মেহেদী হাসান কে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান যে ঘাটের দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে ঘাট এলাকার সকল জমি ব্যক্তি মালিকানা সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ ছিল না বা ইজারাদার জমির মালিকদের জমির ভাড়া বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করবেন এমন কিছু উল্লেখ ছিল না। তিনি আরও জানান যে জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ঘাট দিয়ে কাঙ্খিত পরিমান পণ্য উঠানামা না হওয়ায় তিনি নিজেও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন।এব্যাপারে বাঘাবাড়ি বন্দর কর্তৃপক্ষ মাহবুব আলম তাইফ জানান বেড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুল বাতেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেছেন। জমির মালিক দাবীদারদের ব্যপারে তিনি বলেন- সরকারী গ্যাজেট ভুক্ত সিমানা পিলারের অভ্যন্তরের জমির মালিকানা দাবিদাররা কোনও ক্ষতিপূরণ পাবেন না, তবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিমানা পিলারের বাহিরের জমির মালিক দাবিদারদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।